ঢাকা
শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ (Shahid Buddhijibi Smritisaudha), যা রায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ বা শহীদ বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ নামেও পরিচিত, ঢাকার মোহাম্মদপুর থানার রায়েরবাজার এলাকায় অবস্থিত। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা দেশের শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছিল। তাদের স্মরণে এই স্মৃতিসৌধ নির্মিত হয়েছে।
ইতিহাসে রায়েরবাজার মৃৎশিল্পের জন্য বিখ্যাত ছিল। মুঘল আমলে তুরাগ নদীর তীরে গড়ে ওঠা এই অঞ্চলকে 'কুমারতলী' নামে ডাকা হতো। ব্রিটিশ শাসনামলে এখানে জনবসতি গড়ে ওঠে। লালমাটির প্রাচুর্য ও নদীপথে সহজ যোগাযোগের সুবিধার কারণে এখানে বহু কুমোরের বসতি ছিল।
১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর, পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা বাংলাদেশের সেরা শিক্ষাবিদ, চিকিৎসক, সাংবাদিক, লেখক ও প্রকৌশলীদের বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে। শহীদদের মধ্যে ছিলেন ড. গোবিন্দচন্দ্র দেব, মুনীর চৌধুরী, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, শহীদুল্লাহ কায়সার, ডা. ফজলে রাব্বী প্রমুখ। তাদের লাশ রায়েরবাজারের ইটভাটায় ফেলে রাখা হয়। স্বাধীনতার পর সেখানে পচনধরা লাশের স্তূপ পাওয়া যায়।
১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ সরকার এই বধ্যভূমিতে স্মৃতিসৌধ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়। স্থপতি ফরিদউদ্দীন আহমেদ ও জামি-আল-শফির নকশায় ১৯৯৬ সালে এর নির্মাণকাজ শুরু হয়ে ১৯৯৯ সালে শেষ হয়।
স্মৃতিসৌধের বৈশিষ্ট্য:
- প্রধান কাঠামো: ১৭.৬৮ মিটার উচ্চতা, ০.৯১ মিটার প্রস্থ ও ১১৫.৮২ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি বাঁকা ইটের দেয়াল, যা বুদ্ধিজীবীদের লাশ পাওয়া ইটভাটাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। দেয়ালের ভাঙা অংশ শোক ও বেদনার প্রতীক।
- জানালা: দেয়ালের দক্ষিণ-পশ্চিমে একটি বর্গাকার খোলা স্থান, যা পেছনের আকাশ দেখা যায়—এটি আশার প্রতীক।
- জলাধার ও কালো স্তম্ভ: দেয়ালের সামনে একটি স্থির জলাশয়, যেখান থেকে কালো গ্র্যানাইট পাথরের স্তম্ভ উঠে এসেছে—এটি শোকের গভীরতা বোঝায়।
- ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা: স্মৃতিসৌধ চত্বরে একটি জাদুঘর, পাঠাগার ও কবরস্থান নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
এই স্মৃতিসৌধ বাংলাদেশের ইতিহাসের এক করুণ অধ্যায়ের সাক্ষী, যা আগামী প্রজন্মকে বুদ্ধিজীবী হত্যার নির্মম সত্য স্মরণ করিয়ে দেবে।
পরিদর্শনের সময়সূচী
রায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত সব দর্শনার্থীর জন্য খোলা থাকে। তবে রাতের সময়ে এখানে প্রবেশ নিষিদ্ধ। এছাড়া, শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে প্রবেশের জন্য কোনো টিকিটের প্রয়োজন হয় না।
কিভাবে যাবেন
শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে যেতে চাইলে দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে প্রথমে ঢাকার মোহাম্মদপুরে আসতে হবে। মোহাম্মদপুর থেকে রিকশায় করে সহজেই পৌঁছে যাবেন রায়ের বাজারে অবস্থিত এই স্মৃতিসৌধে।
ঢাকার যেকোনো এলাকা থেকে মোহাম্মদপুর আসার জন্য বাস সার্ভিস পাওয়া যাবে। এছাড়া ব্যক্তিগত গাড়ি বা সিএনজি নিয়েও স্বাচ্ছন্দ্যে এখানে আসা যাবে। মুক্তিযুদ্ধের এই গৌরবময় স্মৃতিস্তম্ভ দেখতে প্রতিদিন অনেক মানুষ এখানে ভিড় করেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই
প্রথম মন্তব্য করুন এবং আপনার অভিজ্ঞতা শেয়ার করুন!